
কন্ঠ প্রতিবেদন।।খুলনার বহুল আলোচিত শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও সংস্কার প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা, চরম অবহেলা এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই প্রকল্পে নির্ধারিত কাজের অর্ধেকও শেষ হয়নি, অথচ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা। নিম্নমানের নির্মাণকাজ, বিল উত্তোলনে অনিয়ম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) সাবেক ও বর্তমান ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।গত ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক শাখা-৩ থেকে সচিব দীপক কুমার রায় স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কেডিএ চেয়ারম্যানকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতি দ্রুত মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে।১৩ বছরেও শেষ হয়নি ৪ কিলোমিটারের সড়ক
২০১৩ সালের ৭ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রথম অনুমোদন পায়। তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮ কোটি টাকা।
পরবর্তীতে কাজের ধীরগতি ও সময়সীমা অতিক্রম করায় ২০২০ সালে প্রথম সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ২৫৯ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু তাতেও প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ব্যয় আরও বাড়িয়ে প্রায় ২৮০ কোটি টাকার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাস্তবায়ন শুরু হলেও ১২ থেকে ১৪ বছর পরও গুরুত্বপূর্ণ এই ৪ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণ শেষ হয়নি। বর্তমানে সড়কজুড়ে রয়েছে বড় বড় খানাখন্দ, কাদা ও ভাঙাচোরা অংশ। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এখন কার্যত ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে; ছোট যানবাহনের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রতিদিন হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
তদন্তে যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে মন্ত্রণালয়ের চিঠি অনুযায়ী, তদন্তে কয়েকটি গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে—কোনো প্রাথমিক সমীক্ষা ছাড়াই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন।
বছরের পর বছর অযৌক্তিক দীর্ঘসূত্রিতা।জিওবি তহবিল থেকে কেডিএ’র নিজস্ব তহবিলে ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা স্থানান্তর। নিম্নমানের নির্মাণকাজ; পিচ ঢালাইয়ের পরপরই উঠে যাওয়ার প্রমাণ।নির্ধারিত কাজের অর্ধেক সম্পন্ন না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ৭০ কোটি টাকার বেশি বিল উত্তোলন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একনেক একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলা ও গাফিলতির বিষয়টি শতভাগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অভিযুক্ত ১১ জনের মধ্যে রয়েছেন কেডিএ’র ৬ জন প্রকৌশলী ও ৫ জন হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী।প্রকৌশল বিভাগ: মো. আরমান হোসেন, মো. মুজিবুর রহমান, কাজী সাবিরুল আলম, এটিএম ওয়াহিদ আজহার, মুনতাসির মামুন এবং শামীম জেহাদ।
হিসাব বিভাগ: মেহেদী হাসান, পলাশ কুমার ঘোষ, শাহানা আক্তার, মো. সাইদুল হক এবং এম এম হোসেন আলী।
কেডিএ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল, কাজ এখন পুরোপুরি বন্ধ প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স-এর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে কেডিএ। তবে এখন পর্যন্ত নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে খুলনার শিল্পাঞ্চল ও শিপইয়ার্ড সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি প্রতিদিন হাজারো শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দার জন্য দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার নির্দেশ এলেও, প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবং সড়কটির দ্রুত সংস্কার নিয়ে জনমনে এখনো রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ৮ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনা, একনেক অনুমোদন ও প্রকল্প-সংক্রান্ত সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত।